আজব কথা>> মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

বার বার আজব কথা শুনিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.  এ. কে. আব্দুল মোমেন হাসির খোরাক হচ্ছেন। তিনি যা বলেন, তা কোন অতি সাধারণ মানুষের মুখেও শোনা যায় না। প্রভুদেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন জানতে চাইলে তার জবাব ছিল: স্বামীর সাথে স্ত্রী’র যেমন থাকে তার মতোই গভীর। সীমান্তে বাংলাদেশী খুন করার ব্যাপারে তার মন্তব্য ছিল: এরা চোর। সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী মহিলাকর্মীদের যৌন হামলার শিকার হওয়া প্রসঙ্গে তার মন্তব্য ছিল: এদের সংখ্যা তেমন অধিক নয়।  ভারতের ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জুী’ (এনআরসি) কিংবা ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন’ (সিএএ –  সিটিজেনশীপ এ্যামেন্ডমেন্ট এ্যাক্ট) বাংলাদেশের জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না। এমন মন্তব্যের যথার্থ প্রমাণে তিনি বললেন: বাংলাদেশের সাথে ভারতের ‘মধুর’ সম্পর্ক রয়েছে। তাহলে কেন ভারতীয়রা বাংলাদেশে ঢুকছে জানতে চাইলে তিনি বললেন: ভারত জোর করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে না। ভারতের তুলনায় আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। এখানে আসলে না খেয়ে থাকতে হবে না, এমন ধারণার ফলে কিছু মানুষ দালালদের সহায়তায় এ দেশে আসছেন।

মোমেনের এই ধরনের কথা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বেশ নেতিবাচক লেখালেখি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন সামাজিক বৈঠকে কিংবা ঘরোয়া আড্ডায়। এমন অর্বাচীন বক্তব্য নিন্দিত হচ্ছে। কেউ কেউ তার জ্ঞানের গভীরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ‘কে স্বামী কে স্ত্রী’ তার উত্তর নিয়ে অনেক ধরনে অশ্রাব্য মন্তব্য করা হচ্ছে।  কতো সংখ্যক বাংলাদেশী মেয়ে ধর্ষিত হলে মোমেনের বোধোদয় হবে?

কারো কারো মতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তিনি রাখেন না। তিনি আমাদের দেশের মান-ইজ্জত ডুবিয়ে দিচ্ছেন। তার মন্তব্য তো আর ঘরের মধ্যে সীমিত থাকে না, সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধরনের কথা শুনে আমরা লজ্জিত হই। তিনি কী লজ্জাবোধ করেন না? তিনি যুৎসই কথা বলতে না পারলে জবাব এড়িয়ে যেতে পারেন। তা না পারলে তার উচিত এই পদ থেকে নেমে যাওয়া।
তার বক্তব্যকে হাসির খোরাক হিসেবে বিবেচনা করলেই চলবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব জড়িত। এইগুলো সুরক্ষার দায়িত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রীর। কিছু না দিয়ে ভারত আমাদের সবকিছু ছিনিয়ে নেয়ার যে অপকর্ম করছে তা প্রতিহত করার দায়িত্ব তার। ভারত-নির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য তিনি অন্যান্য দেশের সাথেও গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলবেন এটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দীপুমনি থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কোন পররাষ্ট্রুমন্ত্রীই আমাদের ‘ভাইটাল’ (অতীব গুরুত্ববহ) বিষয়গুলো নিয়ে দরকষাকষি না করেই ভারতের অতি একান্ত অনুগত হিসেবে সই করে দিচ্ছেন। ভারতকে কুর্নিশ করাই যেন তাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে   –  দেশকে ভারতের আগ্রাসী উপদ্রব হতে রক্ষা করা নয়। কিছু না পেয়েই চাহিবামাত্র ভারতকে অজাড় করে দিয়ে দেয়ার জন্যই তাদেরকে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার দৃষ্টি হবে অনেক দূরে থাকবে, যা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরে । তিনি এমন কিছু করবেন না কিংবা বলবেন না যা হাজার বছর পরেও দেশের জন্য জাতির জন্য কোন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে না পারে। তিনি আমেরিকায় ছিলেন। তিনি আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ইতিহাস ও আমেরিকার বিশ্ব কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য তাদের অবদান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশিত।

তিনি দায়িত্ব পাবার পর আমি ব্যক্তিগতভাবে ভীষণ খুশী হয়েছি – দেশকে ভারতের খবরদারি হতে বের করে আনার জন্য যোগ্য ব্যক্তিই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু গত এক বছরে তার কাজকর্মে আমি যারপর নাই হতাশ হয়েছি। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো কথা বলছেন না। আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে এমন একটি উদাহরণও তিনি তৈরি করতে পারেন নি।
ভারতের এনআরসি’ কিংবা ‘সিএএ’কে মোমেন ভারতের অভ্যন্তরীন ব্যাপার বলে দাবি করছেন। অথছ ভারতের সংসদে ‘সিএএ’ পেশ করার সময় অমিত শা সরাসরি অভিযোগ করেছেন: ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন থামে নি বলেই এই বিল।’

Courtsey: India Today

অমিত শা আরো ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এই বিলটি আনতে সরকার বাধ্য  হয়েছে তার অন্যতম কারণ সেই বন্ধুপ্রতিম বাংলাদেশেই হিন্দু-বৌদ্ধরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।’ অমিত শা’র যুক্তি: “মাননীয় স্পিকার, সে দেশে কিন্তু নরসংহার থামেনি – একাত্তরের পরও বেছে বেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে।”
ইসলামী প্রজাতন্ত্র আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতোই বাংলাদেশেও যে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সে কথাও অমিত শা মনে করিয়ে দিতে ভুলেন নি।

এমন জঘন্য অভিযোগের পরেও পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় একটি কথাও বলে নি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা তাদের সরকার ভারতানুগত ও ভারতের প্রভাবিত না হলে সাথে সাথে কড়া ভাষায় এর প্রতিবাদ করা হতো। অমিত শা’র অভিযোগ প্রত্যাখান করা হতো। ভারতের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হতো, এটা প্রত্যাহার করার, ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশের দাবি করা হতো। ভারতীয় দূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হতো।
কিন্তু কিছুই করা হয় নি। মোমেনরা ভারতের অভিযোগের প্রতিবাদ না করে নীরব থেকে প্রমাণ করলেন অমিত শা’র মিথ্যাচার তথা অভিযোগ সত্যি। এমন নতজানু অবস্থান এমন নীরবতা দেশের অস্তিত্বের জন্য কতোখানি বিপর্যয় বয়ে আনবে তা মোমেনরা বুঝতেই পারছেন না এমনটি নয়, কেবল ক্ষমতায় থাকতেই হবে এমস লোভী মানসিকতার কাছে দেশ-জাতি পরাভূত হচ্ছে বারবার।

ভারতের আশ্বাসকে মোনেনরা বিশ্বাস করেন কীভাবে? যেদেশ কাশ্মীর সমস্যাকে জাতিসংঘে নিয়ে গিয়ে একে আন্তর্জাতিক সমস্যা হিসেবে প্রমাণ করে, কাশ্মীরের গণভোট অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবকে অভিনন্দন জানিয়ে তা বাস্তবায়নে বার বার ওয়াদা করে এক পর্যাযে তা হতে সরে আসে, কাশ্মীরীদেরকে নির্বিচারে হত্যা করে, কাশ্মীরের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা অমান্য করে সংবিধান লঙ্ঘন করে, কাশ্মীরকে ভাগ করে, ভারতের গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার, বিদেশের সাথে – এমনকি বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করে সেইসব চুক্তি অস্বীকার ও লঙ্ঘন করে, আমাদের কাছ থেকে সব নিয়ে আমাদেরকে কিছুই দেয় না সেই ভারতের আশ্বাস (ভারতের কথিত অবৈধ নাগরিক সমস্যা বাংলাদেশের জন্য কোন সমস্যা হবে না) মোমেনরা কীভাবে বিশ্বাস করেন? কেবল শিশুরাই ভারতের আশ্বাসে বিশ্বাস করবে, অন্যরা নয়।

অবৈধ ভারতীয় নাগরিকরা বাংলাদেশের জন্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করবে না, এমন মৌখিক কথা ও আশ্বাস যদি সত্যি হয় তবে লিখিত চুক্তি করার জন্য বলে দেখুন মোমেন কিংবা তার সরকার। দেখা যাক মোদিরা তেমন চুক্তি করতে রাজী হয় কী না। অনেকেই মনে করেন ভারতকে এমন কথা বলার মতো সাহস স্বদেশপ্রেম মোমেনদের নেই। কারণ তাদের ক্ষমতা ভারতের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। ক্ষমতা থাকার বিনিময়ে ভারতের অনুগত-আজ্ঞাবহ হিসেবেই তারেদকে থাকতে হবে।
‘ভারত জোর করে কাউকে বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে না’ এমন সার্টিফিকেট আমাদের বিরুদ্ধে বিষের বাঁশি বিশেষ। এমন মন্তব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো দূরের কথা, কোন দেশপ্রেমিক ও সচেতন ব্যক্তিও করতে পারেন না। এমন মন্তব্যে সত্যিই আমরা উদ্বিগ্ন।

অমুসলিমরা নির্যাতিত হয়ে ভারতে যাচ্ছেন এমন প্রকাশ্য অভিযোগ যে আমাদেরকে কী আসামীর কাঠগড়ায় তোলা হয় নি? ওই অভিযোগের প্রতিবাদ না করে নীরব থেকে আমরা কী ভারতের অভিযোগ মেনে নিচ্ছি? স্পষ্টভাবে বুঝা যায়  ভারত তার অভ্যন্তরীন সমস্যা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়।

অমিত-মোদি বার বার বলছেন: ২০২৪ সালের মধ্যে ভারত মুসলিমমুক্ত হবে। অন্যদিকে এনআরসি তালিকায় আসামে ১৯  লাখ ভারতীয়কে অবৈধ বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদেরকে মধ্যে ১২ লাখের মতো হিন্দু। বাকীরা মুসলিম। এরা সবাই নাকি বাংলাদেশ হতে আসামে প্রবেশ করেছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে কতো হাজার ভারতীয়কে বাংলাদেশী হিসেবে সাজানো হবে তা কেউই জানেন না। এই বিষয়টিকে ভারত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। যখনই কোন সরকার ভাররেতর আগ্রাসী থাবা হতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে, তখনই ভারত লাখ লাখ ভারতীয়কে বাংলাদেশে ঠেলে দেবে কিংবা তেমন হুমকি দিয়ে দেশবিরোধী চুক্তি করতে বাধ্য করবে। একদিন ভারত এই আওয়ামী লীগ সরকারকেই বলতে পারে: বাংলাদেশে ভারতীয় মুদ্রা চালু করতে, এমনকি কনফেডারেশন গঠন   করতে । অন্যকোন দেশপ্রেমিক দলের সরকার হলে তো এই হাতিয়ার ব্যবহার করে তাকে আওয়ামী লীগের মতোই আওয়ামী লীগের মতোই নতজানু ভারতানুগত হতে হবে। মোমেনরা হয়তো তেমন দুর্দিনের কথা মোটেই ভাবেন নি।

আমি অতি সাধারণ মানুষ। একজন নগন্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভারতের ‘বিদেশী খেদাও’ উদ্যোগ এবং আমাদের সরকারের এমন ভূমিকা আমাকে উদ্বিগ্ন করে। ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলে আমার কথাগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব হতো। এই ধরনের কোন সুযোগই জীবনে গ্রহণ করি নি, যদিও এমন সুযোগ তো বারবার এসেছিল। আমার মতো এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা স্বদেশে-প্রবাসে রয়েছেন, যারা ভারতের আগ্রাসী ক্ষমতা প্রতিহত করার মতো যোগ্যতা ও সাহস রাখেন, যারা মুক্তিযুদ্ধ উপরে ওঠার কিংবা সম্পদ বানানোর সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেন নি, করতে চান নি। যারা দেশকে মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার জন্য লড়াই করেছেন। এমন মুক্তিযোদ্ধাদের যে অংশ এখনো বেঁচে আছেন তারা দেশের দুর্গতি দেখে কেবলে নির্জনে নয়, অনেকেই প্রকাশ্যে  চোখের পানি ফেলছেন। তাদের আক্ষেপ: আমরা কেন রাজনীতি হতে সরে এলাম । আমাদের সরে যাবার কারণেই দুর্বল, কাগুজে শিক্ষিত, অযোগ্য-অদেশপ্রেমিকরা ক্ষমতায় চড়ে দেশের সর্বনাশ করছে।  তারা মনে করেন ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার কাছে-কিনারে থাকলে দেশের স্বার্থরক্ষায় আরো ভালো ভূমিকা রাখতে পারতাম।

তাদের যুক্তি অন্যদেশের সহযোগিতায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া আমেরিকা কিংবা ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই শক্তিশালী সাহায্যকারী দেশের কাছে মাথা নত করে নি। ক্ষমতায় আসার জন্য কিংবা থাকার জন্য তারা ওইসব সাহায্যকারী দেশের কাছে ধর্না দেয় নি। তারা জনগণকে ভালোবেসেছেন। তাদের জন্য দেশ গড়েছেন এখনো গড়ে চলছেন।  আমাদের চেয়ে ক্ষদ্র ভিয়েতনামের স্বনির্ভরতা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি দেখে কষ্ট হয়, আমরা কেন পারছি না? আমরা কেন ভারতের গোলাম হয়ে যাচ্ছি? বিজয়ের এই মাসে দেশের অস্তিত্ব নিয়ে আমার মতো অনেক মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে আমার প্রাণপ্রিয় স্বদেশাবসী আরো বেশি উদ্বিগ্ন । আমাদের প্রশ্ন: স্বদেশকে আমরা হারিয়ে ফেলছি কী? *
রচনাকাল: ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
সৌজন্যে: রানার নিউজ, নিউইয়র্ক

PBC24